অঢেল অবৈধ সম্পদের মালিক আ’লীগ নেতাদের দলিল লেখক

প্রকাশিত: ১২:৫৮ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫

টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতাদের দলিল সম্পাদক করেছেন তিনি। শুধু আওয়ামী লীগ নেতা নয়, বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো শিল্প পুলিশের সাবেক এডিশনাল আইজিপি মাহবুবুর রহমান রিপন ও তার আত্মীয় স্বজনের দলিল সম্পাদন হতো তার হাত দিয়েই। এছাড়াও শহরের জটিল জমিগুলোর নিখুতভাবে সম্পাদন করার জন্য বেশ পরিচিত তিনি। এসব করেই অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন কোটি কোটি টাকা। গড়েছেন বাড়ি, কিনেছেন জমি। এছাড়াও বছরে কয়েকবার যান বিদেশে ঘুরতে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এখন তিনি আবার বসেছেন নড়েচরে। জামালপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে এখন তিনি বড় বিএনপি নেতা। তার মাথার উপর রয়েছে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের হাত।

ব্যক্তিটির নাম মোঃ আরজু আকন্দ। তিনি জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়া এলাকার মৃত আব্দুল ওয়াহাব আকন্দের সন্তান। এছাড়াও কেন্দ্রীয় দলিল লেখক সমিতির যুগ্ম-মহাসচিব পদে রয়েছেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা যায়- নিম্ন মধ্য বিত্ত পরিবারের সন্তান ছিলেন আরজু আকন্দ। পেটের টানে ৯০ দশকে পৌরসভা থেকে পয়নিষ্কাশনের ভিসায় দেশের বাইরে পাড়ি জমান তিনি। সেখানে বেশি দিন ছিলেন না তিনি। ফিরে এসে স্ট্যাম্প বিক্রির (ভেন্ডার) কাজ শুরু করেন জামালপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে। এই ব্যবসাতে বেশি মুনাফা না থাকায় দলিল লেখকের নিবন্ধন করেন তিনি। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি আরজু আকন্দকে। টানা ৩০ বছর যাবত জামালপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে ব্যবসা করছেন একচেটিয়া। বিএনপি’র সময় বিএনপি নেতা ও আওয়ামী লীগের সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছের লোক আরজু আকন্দ। তত্ত¡াবধায়ক সরকারের সময় গ্রেপ্তারের ভয়ে বেশ কয়েকদিন রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে পালিয়েও ছিলেন তিনি।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়- আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের ছোট ভাই মাদারগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মির্জা গোলাম কিবরিয়া কবিরের ঘনিষ্ঠ লোক আরজু আকন্দ। টানা ১৭ বছর জামালপুর সদরে মির্জা কবির ও তার পরিবারের সকল জমি ক্রয় বা বিক্রয়ের জন্য দলিল সম্পাদনের কাজ করেছেন তিনি।

এছাড়াও জুলাই আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের পর বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান রিপনের সকল জমির দলিল সম্পাদনের কাজও তিনি করেছেন। আওয়ামী লীগের রাজা চৌধুরী, সেলিম চৌধুরীর জমির দলিল সম্পাদনের কাজও করতেন তিনি। এর মধ্যে খাস জমি বিক্রিতে সহায়তা করা তার অন্যতম পেশা। এছাড়াও শহরের অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতার দলিল সম্পাদনের কাজ হতো তার হাত ধরেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়- কয়েক বছর আগে জামালপুর সাব রেজিস্ট্রি অফিসে চুরির ঘটনা ঘটে। সেখানে চুরি যায় আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক দলিল। সেই ঘটনায় সম্পৃক্ততা রয়েছে আরজু আকন্দের। এছাড়াও আওয়ামী লীগ নেতাদের জমির দলিলের কোনো ফাকফোকড় থাকলে সেসব সমাধান করে দিতেন তিনি। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতাদের জমি ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে সরকারের রাজস্ব কমাতে সাহায্য করতেন আরজু আকন্দ। এভাবে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছ থেকে নিতেন মোটা অঙ্কের টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়- একসময় পেটের টানে বিদেশে পাড়ি জমানো আরজু আকন্দ হয়েছেন বিশাল সম্পদের মালিক। জামালপুর শহরের দেওয়ানপাড়া এলাকায় তিন তলা একটি ভবন, বোষপাড়া এলাকায় চারতলা একটি ভবন, সরকারী ফিসারী মোড় এলাকায় পাঁচ তলা একটি নির্মানাধীন ভবনের মালিক তিনি। এছাড়াও নামে বেনামে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তির মালিক তিনি। গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে দেশে বিদেশে ভ্রমন করেছেন আরজু। আওয়ামী সরকার পতনের পরেও বিপুল পরিমান অর্থ ব্যয় করে এখনো দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়ান তিনি। ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দুবাইসহ বেশ কয়েকটি দেশ ভ্রমন করা সম্পন্ন করেছেন আরজু আকন্দ। এছাড়াও একজন ব্যাংক কর্মকর্তার স্ত্রী ও দুই সন্তানের জননীকে বিয়ের পরেও তাকে দেখভাল না করার অভিযোগ রয়েছে আরজু আকন্দের বিরুদ্ধে। শহরতলীর মনিরাজপুর এলাকার একজন প্রবাসীর স্ত্রীকে বিয়ে করে বোষপাড়া এলাকার চারতলা ভবনে রেখেছেন তিনি। সেই নারীর জমি নিয়েও ঝামেলা করেছেন আরজু আকন্দ।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন দিবস পালন করা ও সেখানে অর্থ ব্যয় করা আরজু এখন রয়েছে বিএনপির ছায়াতলে।

স্থানীয় দলিল লেখকরা বলছেন-‘টানা ১৭ বছর আওয়ামী লীগ নেতারা কোথায় কিভাবে কতটুকু জমির মালিক হয়েছে সেইসব তথ্য রয়েছে আরজু আকন্দের কাছে। তাই আরজু আকন্দকে আইনের আওতায় আনলে বের হয়ে আসবে সকল তথ্য।

এবিষয়ে আরজু আকন্দ বলেন, আমি জামালপুর প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জামালপুল দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক। এছাড়াও আমার দুটি স্থানীয় দুটি পক্রিকা রয়েছে।

তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত হয়ে আমাকে জামালপুর দলিল সমিতির সভাপতি ঘোষণা করেন। এছাড়া সম্প্রতি একটা মামলায় আমাকে হুকুমের আসামী করে। যে গত বৃহস্পতিবার আমি জামিন নিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হচ্ছে, এগুলো সম্পুর্ণ মিয়া ও বানোয়াট। একটি পক্ষ আমাকে হেয় করতে এসব করাচ্ছে। আপনি জামালপুরে আসেন, আমি সকল ডকুমেন্টস আপনাকে দেখাবো।